এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য এআই সংক্রান্ত পাঁচটি জরুরি অগ্রাধিকার। বাংলাদেশে এআই এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু প্রযুক্তি শেখানো বা বড় বড় এআই সেমিনার আয়োজনের পাশাপাশি এআই এর অপব্যবহার থেকে সাধারণ মানুষ, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা তৈরি করা এখন অত্যন্ত জরুরি। ফিউচার মাইন্ড এআই এর এআই এথিক্যাল ইউজ এবং এআই এওয়ারনেস কার্যক্রমের আলোকে পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের সমন্বিতভাবে কাজ করা উচিত।

(এক) অনুমতি ছাড়া কারো মুখ বা পরিচয় ব্যবহার করে এআই কন্টেন্ট তৈরি প্রতিরোধ। জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে এখন খুব সহজেই একজন ব্যক্তির ছবি, মুখ, কন্ঠ বা পরিচয় নকল করে বাস্তবসম্মত ছবি ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। কারো অনুমতি ছাড়া তার মুখ ব্যবহার করে অপমানজনক, অশ্লীল, বিভ্রান্তিকর বা অপরাধমূলক কনটেন্ট তৈরি হলে একজন মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও পেশাগত জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ব্যক্তির সম্মতি বা অনুমতি ছাড়া তার মুখ, কন্ঠ বা পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষতিকর এআই জেনারেটেড বা ডিপ ফেক কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতিমালা, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে শেখাতে হবে এআই দিয়ে তৈরি কোন ভিডিও দেখলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া যাবে না।

(দুই) এআই ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ভয় ছড়ানো বন্ধ করা। ভুয়া ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা, হামলা, মহামারি, ব্যাংক সংকট কিংবা অন্য কোন দুর্যোগের এআই ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই হাজার বা লাখো মানুষ বিভ্রান্ত হতে পারে। এ ধরনের কন্টেন্ট বাস্তব ঘটনার মতো মনে হওয়ায় জনমনে আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সরকারের উচিত জরুরি ও দুর্যোগ সংক্রান্ত এআই মিসইনফরমেশন শনাক্ত করার জন্য একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে দ্রুত সত্যতা যাচাই, পাবলিক ক্লারিফিকেশন এবং ভুয়া কন্টেন্ট এর বিরুদ্ধে প্ল্যাটফর্ম লেভেল অ্যাকশন নেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

(তিন)এআই দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী মিথ্যা প্রচারণা প্রতিরোধ। এআই জেনারেটেড ছবি, ভিডিও ও অডিও ব্যবহার করে বাংলাদেশের কোন ঘটনা, স্থান, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। এমনকি দেশে ঘটেনি এমন ঘটনাকেও বাংলাদেশের ঘটনা হিসেবে দেখিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এটি শুধু মিসইনফরমেশনের সমস্যা নয়, পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হলে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, পর্যটন, বিনিয়োগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাংলাদেশের নামে ছড়ানো সন্দেহজনক ভাইরাল এআই কন্টেন্ট দ্রুত যাচাই করার জন্য একটি এআই মিসইনফরমেশন ভেরিফিকেশন এন্ড রেসপন্স সিস্টেম তৈরি করা প্রয়োজন। তবে এই ব্যবস্থা যেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা বৈধ সমালোচনা দমনের হাতিয়ার না হয় তার জন্য স্বচ্ছ সংজ্ঞা, প্রমাণভিত্তিক যাচাই এবং জবাবদিহিতা জরুরি।

(চার) এআই দিয়ে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ও জনমত প্রভাবিত করার অপচেষ্টা প্রতিরোধ। নির্বাচন বা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বক্তব্য, নকল কন্ঠ, ফ্যাব্রিকেটেড ভিডিও কিংবা সম্পাদিত এআই কন্টেন্ট ছড়িয়ে দিলে খুব দ্রুত জনমত প্রভাবিত হতে পারে। এই সমস্যার সমাধান দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, সব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির জন্য সমান এবং নিরপেক্ষ নিয়মের মাধ্যমে করতে হবে। রাজনৈতিক এআই জেনারেটেড বা ম্যাটেরিয়ালি অল্টারড কন্টেন্টের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ডিসক্লোজার, সন্দেহজনক ভাইরাল কন্টেন্টের দ্রুত ভেরিফিকেশন, ইমপারসনেশন ও ডিসেপটিভ ডিপ ফেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের জন্য সহজ ফ্যাক্ট চেকিং চ্যানেল তৈরি করা যেতে পারে। একই নিয়ম সরকার, বিরোধী দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক পক্ষের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া জরুরি।

(পাঁচ) এআই দিয়ে ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণা ও চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে তৈরি কন্টেন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা। এটি সম্ভবত সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকিগুলোর মধ্যে একটি। কারো ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ভুয়া, অন্তরঙ্গ দৃশ্য, আপত্তিকর ছবি, নকল অডিও বা ফ্যাব্রিকেটেড কনভার্সেশন তৈরি করে অর্থদাবি, হুমকি, প্রতিশোধ কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হতে পারে। বিশেষ করে নারী, শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এর শিকার হতে পারেন। তাই এআই এনেবলড ব্ল্যাকমেইল, নন-কনসেনশুয়াল সিন্থেটিক ইন্টিমেট কন্টেন্ট, ইমপারসোনেশন, ফ্রড এবং ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন মোকাবেলায় দ্রুত রিপোর্টিং ও সহায়তা দরকার। অভিযোগ পাওয়ার পর ক্ষতিকর কন্টেন্ট দ্রুত সংরক্ষণ বা যাচাই, প্রয়োজনমতো আইনি উদ্যোগ, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগীকে আইনগত ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া থাকা উচিত।
এই পাঁচটি সমস্যাকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে না দেখে সরকার চাইলে একটি কেন্দ্রীয় ন্যাশনাল এআই সেফটি, এথিক্যাল ইউজ এন্ড মিসইনফরমেশন রেসপন্স ফ্রেমওয়ার্ক-এর অধীনে আনতে পারেন। এর তিনটি মূল স্তম্ভ হতে পারে-প্রিভেনশন, ভেরিফিকেশন এবং রেসপন্স। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের মধ্যে এআই লিটারেসি এবং এথিক্যাল ইউজ অ্যাওয়ারনেস ছড়ানো জরুরি।
ফিউচার মাইন্ড এআই (Since 2025) -পাইওনিয়ার অব এআই এথিক্যাল ইউজ এন্ড এআই অ্যাওয়ারনেস ইন বাংলাদেশ। এমডি মশিউর রহমান -এআই আর্টিস্ট এন্ড অ্যানালিস্ট, এআই এথিক্যাল ইউজ এন্ড এআই অ্যাওয়ারনেস; ফাউন্ডার, ফিউচার মাইন্ড এআই; অথর অব ‘এআই: ডার্ক এন্ড লাইট’।
মূল বার্তা: এআই শেখানোর পাশাপাশি এআই এর নিরাপদ, নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করার অবকাঠামো এখনই তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তিটি যত দ্রুত এগোবে, তার অপব্যবহার প্রতিরোধের প্রস্তুতিও তত দ্রুত এগোতে হবে।
